ORS (Oral Rehydration Salts): সঠিক নিয়মে বানানো, ব্যবহার ও বিপদের লক্ষণ

ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট (ORS)-এর একটি প্যাকেট
ছবি: Cjp24, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons
সতর্কতা: এই লেখা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্য ও সচেতনতার জন্য। এটি কোনো ডাক্তারি পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। যেকোনো ওষুধ শুরু, বন্ধ বা মাত্রা বদলানোর আগে অবশ্যই রেজিস্টার্ড ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।

ORS কী?

ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা, বমি, অথবা প্রচণ্ড গরমে ঘাম হয়ে শরীর থেকে জল ও লবণ বেরিয়ে গেলে যে জিনিসটি সবচেয়ে আগে দরকার, তা হলো ORS, অর্থাৎ ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট (Oral Rehydration Salts)। এটি গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড (লবণ), পটাসিয়াম ক্লোরাইড এবং ট্রাইসোডিয়াম সাইট্রেটের একটি নির্দিষ্ট মিশ্রণ। নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিষ্কার জলে গুলে খেতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের মতে ORS বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছে। ORS WHO-র অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় এবং ভারতের NLEM 2022-তে আছে। ভারতের NLEM 2022-এ ORS আর জিঙ্ক সালফেট দুটোই আছে। এই লেখায় জানব ORS কেন জরুরি, কীভাবে সঠিকভাবে বানাতে হয়, কোন ভুলগুলো এড়াতে হবে এবং কখন আর দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।

এক নজরে

  • কী: শরীরের জল ও লবণের ঘাটতি (ডিহাইড্রেশন) পূরণের মিশ্রণ
  • তালিকা: WHO Model List of Essential Medicines এবং NLEM 2022
  • রূপ: গুঁড়ো (স্যাশে বা প্যাকেট), কিছু ক্ষেত্রে তৈরি করা তরল
  • শিশুদের ডায়রিয়ায়: WHO ও ভারত সরকার ORS-এর সঙ্গে জিঙ্ক দেওয়ার পরামর্শ দেয় (মাত্রা স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তার ঠিক করবেন)

ডিহাইড্রেশন কেন বিপজ্জনক?

ডায়রিয়ায় প্রতিবার পাতলা পায়খানার সঙ্গে শরীর থেকে প্রচুর জল এবং সোডিয়াম, পটাসিয়ামের মতো লবণ বেরিয়ে যায়। এগুলো হৃৎপিণ্ড, কিডনি, পেশি ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের জন্য দরকারি। ঘাটতি বেশি হলে শরীর দুর্বল হয়, প্রস্রাব কমে যায়, আর গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তচাপ নেমে গিয়ে প্রাণসংশয় পর্যন্ত হতে পারে। WHO-র তথ্য অনুযায়ী (মার্চ ২০২৪), পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ ডায়রিয়া, আর ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ডিহাইড্রেশন। শিশু ও বয়স্কদের শরীরে জল কমে যায় খুব তাড়াতাড়ি, তাই তাঁদের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দরকার।

ORS কীভাবে কাজ করে?

শুধু জল খেলে অন্ত্র তা সবসময় ঠিকমতো শোষণ করতে পারে না, বিশেষ করে ডায়রিয়ার সময়। ORS-এর বিশেষত্ব হলো এর গ্লুকোজ ও সোডিয়ামের নির্দিষ্ট অনুপাত। অন্ত্রের দেওয়ালে এমন ব্যবস্থা আছে, যা গ্লুকোজ আর সোডিয়ামকে একসঙ্গে শোষণ করে, আর তাদের পিছু পিছু জলও শরীরে ঢুকে যায়। ডায়রিয়ার সময়েও এই ব্যবস্থা মোটামুটি কাজ করে। তাই ORS খেলে শরীর হারানো জল ও লবণ দ্রুত ফিরে পায়। WHO ও ইউনিসেফ এখন "লো-অসমোলারিটি" ORS সুপারিশ করে। পুরোনো ফর্মুলার তুলনায় এতে গ্লুকোজ ও লবণের ঘনত্ব একটু কম, এবং গবেষণায় দেখা গেছে এতে বমি ও পায়খানার পরিমাণ কিছুটা কমে।

একটা বিষয় পরিষ্কার জেনে রাখুন: ORS ডায়রিয়া বন্ধ করার ওষুধ নয়। এটি ডিহাইড্রেশন আটকায় ও সারায়। ORS খাওয়ার পরও কিছুদিন পাতলা পায়খানা চলতে পারে, এতে ঘাবড়াবেন না, কিন্তু ORS চালিয়ে যান এবং বিপদের লক্ষণের দিকে নজর রাখুন।

সঠিকভাবে ORS বানানোর নিয়ম

  • প্রথমে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।
  • প্যাকেটের গায়ে যত পরিমাণ জলের কথা লেখা আছে (বেশিরভাগ প্যাকেটে এক লিটার), ঠিক ততটাই পরিষ্কার পানীয় জল নিন। সম্ভব হলে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা জল ব্যবহার করুন।
  • পুরো প্যাকেটের গুঁড়ো সেই জলে মিশিয়ে ভালো করে গুলে নিন।
  • জল কম বা বেশি দেবেন না। কম জলে মেশালে মিশ্রণ বেশি ঘন হয়ে ক্ষতি করতে পারে, বেশি জলে কার্যকারিতা কমে।
  • চিনি, গুড়, লবণ বা অন্য কিছু আলাদা করে মেশাবেন না।
  • দুধ, ফলের রস, চা বা সফট ড্রিংকে ORS গুলবেন না।
  • গুলে রাখা ORS কতক্ষণ ব্যবহার করা যাবে, তা প্যাকেটের নির্দেশ দেখে নিন। পুরোনো দ্রবণ ফেলে দিয়ে নতুন বানান।

কীভাবে খাওয়াবেন? (সাধারণ নিয়ম)

কতটা ORS খেতে হবে, তা নির্ভর করে বয়স, ওজন ও কতবার পায়খানা হচ্ছে তার উপর। শিশুর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তারের নির্দেশ মতো দিন। সাধারণ কিছু নিয়ম:

  • একবারে অনেকটা না দিয়ে অল্প অল্প করে, ঘন ঘন চুমুক দিয়ে বা চামচে করে দিন।
  • বমি হলে ঘাবড়াবেন না। একটু অপেক্ষা করে আবার ধীরে ধীরে দিন।
  • বুকের দুধ খাওয়া শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না, চালিয়ে যান।
  • বড়রা ও বড় শিশুরা স্বাভাবিক হালকা খাবার খেতে পারেন। ডায়রিয়ায় উপোস রাখার দরকার নেই।

সাধারণ ভুল ধারণা ও ভুল

  • এনার্জি ড্রিংক বা স্পোর্টস ড্রিংক মানেই ORS নয়। এগুলোতে চিনি অনেক বেশি এবং লবণের অনুপাত আলাদা, যা ডায়রিয়া বাড়াতেও পারে। ভারতে খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI ১৪ অক্টোবর ২০২৫-এর আদেশে আগের যে অনুমতিতে ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে "ORS" শব্দ ব্যবহার করা যেত, তা প্রত্যাহার করেছে। ১৫ অক্টোবর ২০২৫-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, খাদ্য বা পানীয় পণ্যের নামে, লেবেলে বা ট্রেডমার্কে "ORS" (আগে-পরে অন্য শব্দ জুড়ে হলেও) ব্যবহার করা যাবে না। তাই প্যাকেটে "WHO formula" বা ওষুধ হিসেবে অনুমোদিত কি না দেখে কিনুন।
  • ফলের রস বা কোল্ড ড্রিংক ডিহাইড্রেশনের চিকিৎসা নয়।
  • নিজে থেকে ডায়রিয়া বন্ধ করার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না, বিশেষ করে শিশুদের। কখন এগুলো দরকার, তা ডাক্তার ঠিক করবেন।

সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

সঠিকভাবে তৈরি ORS সাধারণত নিরাপদ। খুব তাড়াতাড়ি বেশি খেলে বমি হতে পারে, তাই ধীরে ধীরে খাওয়াতে হয়। ভুল অনুপাতে (কম জলে) বানালে রক্তে সোডিয়াম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষত শিশুদের। এই কারণেই প্যাকেটের নির্দেশ মানা এত জরুরি।

কারা বিশেষ সাবধান থাকবেন?

  • যাঁদের কিডনির রোগ আছে বা ডায়ালাইসিস চলছে।
  • যাঁদের হার্ট ফেলিওর আছে বা ডাক্তার জল ও লবণ খাওয়া সীমিত রাখতে বলেছেন।
  • যাঁদের ডায়াবেটিস আছে। ORS-এ গ্লুকোজ থাকে, তাই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিন, তবে ডিহাইড্রেশন অবহেলা করবেন না।

বিপদের লক্ষণ: দেরি না করে হাসপাতালে যান

  • শিশু খুব নেতিয়ে পড়েছে, ঘুম ঘুম ভাব বা জাগানো যাচ্ছে না।
  • কিছুই খেতে বা পান করতে পারছে না, অথবা যা খাচ্ছে সব বমি করে দিচ্ছে।
  • পায়খানায় রক্ত।
  • অনেক ঘণ্টা প্রস্রাব হয়নি।
  • চোখ বসে গেছে, মুখ শুকনো, কাঁদলে চোখে জল আসছে না।
  • খুব বেশি জ্বর বা খিঁচুনি।
  • ঘন ঘন প্রচুর জলের মতো পায়খানা (কলেরার মতো)।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

বাড়িতে নুন-চিনির জল দিয়ে কি ORS-এর কাজ হয়?

প্যাকেটের ORS না থাকলে জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়িতে তৈরি দ্রবণের কথা বলেন, কিন্তু অনুপাত ভুল হলে ক্ষতি হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব অনুমোদিত ORS প্যাকেট জোগাড় করুন এবং স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।

গরমে ক্লান্ত লাগলে কি ORS খাওয়া যায়?

প্রচুর ঘাম হয়ে জল ও লবণ কমে গেলে ORS কাজে লাগতে পারে। তবে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ (খুব বেশি শরীরের তাপ, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া) থাকলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান।

জিঙ্ক কেন দেওয়া হয়?

WHO-র তথ্য অনুযায়ী, জিঙ্ক ডায়রিয়ার সময়কাল প্রায় ২৫% কমায় এবং পায়খানার পরিমাণ প্রায় ৩০% কম হওয়ার সঙ্গে যুক্ত। মাত্রা ও কতদিন দেবেন, তা স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তার ঠিক করবেন।

ORS কি সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যায়?

ORS ও জিঙ্ক সালফেট ভারতের জাতীয় অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় (NLEM 2022) আছে। কাছের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা আশা কর্মীর কাছে খোঁজ নিন।

শেষ কথা

ORS সস্তা, সহজলভ্য এবং প্রাণ বাঁচাতে পারে, কিন্তু এর জোর তখনই, যখন সঠিক নিয়মে বানানো ও খাওয়ানো হয়। বাড়িতে, বিশেষত ছোট শিশু ও বয়স্ক মানুষ থাকলে, কয়েকটা অনুমোদিত ORS প্যাকেট সবসময় রাখুন, আর বিপদের লক্ষণ দেখলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

উৎস (Sources)

মেডিকেল ডিসক্লেমার

ঔষধ জানুন – Medicine Guide Bangla একটি তথ্যভিত্তিক ব্লগ। এখানে লেখা তথ্য সরকারি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত উৎস থেকে পড়ে নিজের ভাষায় সাজানো হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের শরীর, রোগ ও অন্য ওষুধ আলাদা। তাই এই লেখা দেখে নিজে নিজে কোনো ওষুধ খাবেন না বা বন্ধ করবেন না। ডোজ ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আপনার ডাক্তার নেবেন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান। আমরা কোনো ওষুধ বা ব্র্যান্ড বিক্রি বা প্রচার করি না।

লেখক: ঔষধ জানুন সম্পাদকীয় দল · শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac): ব্যথায় ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

সালবিউটামল ইনহেলার (Salbutamol): হাঁপানিতে ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

মন্টেলুকাস্ট (Montelukast): হাঁপানি ও অ্যালার্জিতে ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা