মেটফরমিন (Metformin): ডায়াবেটিসে কী কাজ করে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

মেটফরমিন কী?
ভারতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা অনেক, আর পশ্চিমবঙ্গেও প্রায় প্রতিটি পরিবারে কেউ না কেউ "সুগারের ওষুধ" খান। এই ওষুধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো ও বহুল ব্যবহৃত একটি হলো মেটফরমিন (Metformin)। এটি বিগুয়ানাইড (biguanide) শ্রেণির ওষুধ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চিকিৎসা নির্দেশিকায় টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় এটিকে প্রায়ই প্রথম ধাপের ওষুধ হিসেবে ধরা হয়। মেটফরমিন WHO-র অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় ও ভারতের NLEM 2022-তে আছে। এটি প্রেসক্রিপশন ছাড়া খাওয়ার ওষুধ নয়। এই লেখার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য দেওয়া, যাতে আপনি নিজের ওষুধ সম্পর্কে ভালো করে বুঝতে পারেন এবং ডাক্তারকে সঠিক প্রশ্ন করতে পারেন। ওষুধ শুরু করা, বন্ধ করা বা মাত্রা বদলানো শুধুমাত্র ডাক্তারের সিদ্ধান্ত।
এক নজরে
- শ্রেণি: বিগুয়ানাইড, মুখে খাওয়ার ডায়াবেটিসের ওষুধ
- তালিকা: WHO Model List of Essential Medicines এবং NLEM 2022
- রূপ: সাধারণ ট্যাবলেট এবং ধীরে ধীরে ওষুধ ছাড়ে এমন ট্যাবলেট (SR/ER/XR)
- বিক্রি: শুধুমাত্র রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে
মেটফরমিন কী কাজে ব্যবহার হয়?
NHS ও MedlinePlus অনুযায়ী মেটফরমিনের প্রধান ব্যবহার হলো টাইপ ২ ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা। এটি সাধারণত সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি দেওয়া হয়, এগুলোর বদলে নয়। অনেক সময় অন্য ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের সঙ্গেও দেওয়া হয়। MedlinePlus জানায়, ডাক্তার কখনো অন্য কারণেও এটি দিতে পারেন। সেই সিদ্ধান্ত একান্তই ডাক্তারের। মনে রাখবেন, টাইপ ১ ডায়াবেটিসে মেটফরমিন ইনসুলিনের বিকল্প নয়। ওজন কমানোর জন্য নিজে থেকে মেটফরমিন খাওয়াও ঠিক নয়।
মেটফরমিন কীভাবে কাজ করে?
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না (একে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলে), আর লিভার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্লুকোজ রক্তে ছাড়ে। মেটফরমিন মূলত তিনভাবে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়:
- লিভার থেকে গ্লুকোজ তৈরি ও রক্তে ছাড়া কমায়।
- পেশি ও অন্যান্য কোষকে ইনসুলিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে, ফলে কোষগুলো রক্ত থেকে গ্লুকোজ ভালোভাবে নিতে পারে।
- অন্ত্র থেকে গ্লুকোজ শোষণ কিছুটা কমায়।
মেটফরমিন অগ্ন্যাশয় থেকে জোর করে বাড়তি ইনসুলিন বের করে না। তাই একা খেলে সাধারণত রক্তে শর্করা খুব বেশি নেমে যাওয়ার (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু অন্য সুগারের ওষুধ বা ইনসুলিনের সঙ্গে খেলে, অথবা খাবার বাদ দিলে বা বেশি মদ্যপান করলে, শর্করা কমে যেতে পারে।
কীভাবে খাওয়া হয়? (সাধারণ নিয়ম)
মাত্রা ও সময় রোগীর রক্তে শর্করা, কিডনির অবস্থা এবং অন্য ওষুধ দেখে ডাক্তার ঠিক করেন। এখানে কোনো ডোজ দেওয়া হচ্ছে না। লিফলেটে সাধারণত যা থাকে:
- পেটের সমস্যা কমাতে খাবারের সঙ্গে বা খাবারের ঠিক পরে খেতে বলা হয়।
- অনেক সময় ডাক্তার কম মাত্রা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাড়ান, যাতে শরীর মানিয়ে নিতে পারে।
- SR/XR ট্যাবলেট সাধারণত গোটা গিলতে হয়, ভাঙা বা চিবানো নয়।
- সুগার কমে গেছে বা স্বাভাবিক হয়েছে বলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না। ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করুন।
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
NHS ও MedlinePlus অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পেটের সমস্যা, বিশেষ করে ওষুধ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহে:
- বমি ভাব বা বমি
- ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা
- পেট ব্যথা, পেট ফাঁপা
- খিদে কমে যাওয়া
- মুখে ধাতব স্বাদ
অনেকের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে এগুলো কমে যায়। সমস্যা না কমলে ডাক্তারকে জানান। অনেক সময় মাত্রা বা ট্যাবলেটের ধরন বদলে সমাধান হয়।
দীর্ঘদিন খেলে: ভিটামিন B12
দীর্ঘদিন মেটফরমিন খেলে কারও কারও শরীরে ভিটামিন B12 কমে যেতে পারে। UK-র ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা MHRA জুন ২০২২-এ জানিয়েছে, এটি একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বেশি মাত্রায় ও বেশিদিন খেলে ঝুঁকি বাড়ে, তবে ডাক্তার না বললে মেটফরমিন বন্ধ করা উচিত নয়। এর লক্ষণ হতে পারে খুব ক্লান্তি, রক্তাল্পতা, হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা বা অবশ ভাব। ডায়াবেটিসের নিজের কারণেও স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে, তাই এমন লক্ষণ হলে ডাক্তারকে বলুন। প্রয়োজনে তিনি রক্ত পরীক্ষা করাবেন।
গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ল্যাকটিক অ্যাসিডোসিস
খুব বিরল কিন্তু গুরুতর একটি সমস্যা হলো ল্যাকটিক অ্যাসিডোসিস, অর্থাৎ রক্তে ল্যাকটিক অ্যাসিড জমে যাওয়া। এর ঝুঁকি বাড়ে কিডনির গুরুতর সমস্যা, লিভারের রোগ, অতিরিক্ত মদ্যপান, গুরুতর সংক্রমণ, শরীরে জলের তীব্র অভাব (যেমন খুব বমি-পায়খানা) বা অক্সিজেনের অভাব হয় এমন অবস্থায়। নিচের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যান:
- অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা ক্লান্তি
- তীব্র পেশি ব্যথা
- দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নেওয়া
- তীব্র পেট ব্যথা, বমি
- শরীর ঠান্ডা লাগা, মাথা ঘোরা, হৃৎস্পন্দন ধীর বা অনিয়মিত হওয়া
এছাড়া মুখ, ঠোঁট বা গলা ফুলে যাওয়ার মতো গুরুতর অ্যালার্জি হলেও সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিন।
কারা বিশেষ সাবধান থাকবেন?
- কিডনির রোগ: মেটফরমিন কিডনি দিয়ে শরীর থেকে বেরোয়। তাই ডাক্তার নিয়মিত কিডনির পরীক্ষা (যেমন eGFR) করাতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী মাত্রা ঠিক করেন বা ওষুধ বদলান।
- লিভারের রোগ বা নিয়মিত মদ্যপান।
- এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানে আয়োডিনযুক্ত কনট্রাস্ট ডাই নেওয়ার আগে: MedlinePlus অনুযায়ী এক্স-রে পরীক্ষায় ডাই নেওয়া, অস্ত্রোপচার (দাঁতের অস্ত্রোপচারসহ) বা বড় কোনো চিকিৎসা-পদ্ধতির আগে ডাক্তারকে জানান যে আপনি মেটফরমিন খান।
- অপারেশনের আগে: সার্জন ও অ্যানেস্থেটিস্টকে জানান।
- গুরুতর বমি-পায়খানা বা জলশূন্যতা হলে: ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
- গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান: শুধুমাত্র ডাক্তারের পরামর্শে।
অন্য ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া
কিছু ওষুধ মেটফরমিনের প্রভাব বা ঝুঁকি বদলে দিতে পারে, যেমন কিছু মূত্রবর্ধক ওষুধ, স্টেরয়েড, কিছু রক্তচাপের ওষুধ এবং অন্য সুগারের ওষুধ। মদ্যপান ল্যাকটিক অ্যাসিডোসিস ও শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। নতুন কোনো ওষুধ বা ভেষজ শুরু করার আগে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে জানান।
জেনেরিক বনাম ব্র্যান্ড
মেটফরমিন বহু বছর ধরে জেনেরিক ওষুধ হিসেবে পাওয়া যায় এবং জন ঔষধি কেন্দ্রেও কম দামে মেলে। তবে একটা জিনিস খেয়াল রাখুন: অনেক পণ্যে মেটফরমিনের সঙ্গে অন্য সুগারের ওষুধ (যেমন গ্লিমেপিরাইড বা ভিল্ডাগ্লিপটিন) মেশানো থাকে। সাধারণ ট্যাবলেট আর SR ট্যাবলেটও এক নয়। তাই প্রেসক্রিপশনে ঠিক যে ওষুধ, যে শক্তি ও যে ধরন লেখা আছে, সেটাই কিনুন। নিজে থেকে বদলাবেন না।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
মেটফরমিন কি কিডনি নষ্ট করে?
প্রচলিত ধারণা থাকলেও, মেটফরমিন নিজে কিডনির ক্ষতি করে বলে সরকারি লিফলেটে উল্লেখ নেই। তবে কিডনি দুর্বল হলে ওষুধ শরীরে জমে ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা জরুরি।
সুগার নিয়ন্ত্রণে এলে কি ওষুধ ছেড়ে দেওয়া যায়?
নিজে থেকে নয়। ডাক্তার পরীক্ষার ফল দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।
ওষুধ খেলে কি খাবারে নিয়ম মানতে হবে না?
অবশ্যই মানতে হবে। সুষম খাবার, নিয়মিত হাঁটা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ মেটফরমিনের কাজের ভিত্তি।
এক ডোজ ভুলে গেলে কী করব?
লিফলেট ও ডাক্তারের নির্দেশ মেনে চলুন। সাধারণত ভুলে যাওয়া ডোজের বদলে পরের বার দ্বিগুণ খেতে নিষেধ করা হয়।
শেষ কথা
মেটফরমিন টাইপ ২ ডায়াবেটিসের একটি পরীক্ষিত, সাশ্রয়ী এবং বহুল ব্যবহৃত ওষুধ। এর সবচেয়ে বেশি দেখা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পেটের সমস্যা, আর বিরল কিন্তু গুরুতর ঝুঁকি ল্যাকটিক অ্যাসিডোসিস। নিয়মিত সুগার, কিডনি ও B12 পরীক্ষা এবং ডাক্তারের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা নিরাপদ ব্যবহারের মূল কথা।
উৎস (Sources)
- NHS – Metformin: https://www.nhs.uk/medicines/metformin/
- MedlinePlus – Metformin: https://medlineplus.gov/druginfo/meds/a696005.html
- MHRA Drug Safety Update – Metformin and reduced vitamin B12 levels (20 June 2022): https://www.gov.uk/drug-safety-update/metformin-and-reduced-vitamin-b12-levels-new-advice-for-monitoring-patients-at-risk
- WHO Model List of Essential Medicines, 23rd List (2023): https://iris.who.int/bitstream/handle/10665/371090/WHO-MHP-HPS-EML-2023.02-eng.pdf
- National List of Essential Medicines 2022 (CDSCO) – Section 18.3.1.6: https://cdsco.gov.in/opencms/resources/UploadCDSCOWeb/2018/UploadConsumer/nlem2022.pdf
মেডিকেল ডিসক্লেমার
ঔষধ জানুন – Medicine Guide Bangla একটি তথ্যভিত্তিক ব্লগ। এখানে লেখা তথ্য সরকারি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত উৎস থেকে পড়ে নিজের ভাষায় সাজানো হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের শরীর, রোগ ও অন্য ওষুধ আলাদা। তাই এই লেখা দেখে নিজে নিজে কোনো ওষুধ খাবেন না বা বন্ধ করবেন না। ডোজ ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আপনার ডাক্তার নেবেন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান। আমরা কোনো ওষুধ বা ব্র্যান্ড বিক্রি বা প্রচার করি না।
লেখক: ঔষধ জানুন সম্পাদকীয় দল · শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন