ডমপেরিডন (Domperidone): বমিতে ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

ডমপেরিডন অণুর ত্রিমাত্রিক বল-স্টিক মডেল
ছবি: Ben Mills, পাবলিক ডোমেইন, Wikimedia Commons
সতর্কতা: এই লেখা শুধুমাত্র সাধারণ তথ্য ও সচেতনতার জন্য। এটি কোনো ডাক্তারি পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। যেকোনো ওষুধ শুরু, বন্ধ বা মাত্রা বদলানোর আগে অবশ্যই রেজিস্টার্ড ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।

ডমপেরিডন কী?

হঠাৎ বমি বমি ভাব, খাওয়ার পর গা গুলোনো বা বারবার বমি হলে অনেক পরিবারে প্রথম যে ওষুধের নাম ওঠে, তা ডমপেরিডন (Domperidone)। NHS অনুযায়ী এটি একটি বমি-রোধী (anti-sickness বা অ্যান্টি-এমেটিক) ওষুধ, যা গা গুলোনো ও বমি কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু খুব কম লোকই জানেন যে এই ওষুধ হৃৎস্পন্দনের ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে, আর সেই কারণে এটি সাধারণত অল্প সময়ের জন্যই দেওয়া হয়। ছোট শিশুদের পেটের সংক্রমণজনিত বমিতে এর ব্যবহার নিয়েও স্পষ্ট সতর্কতা আছে। এই লেখায় সেই তথ্যগুলো একসঙ্গে সাজানো হলো, যাতে ওষুধটি নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে আরও সচেতনভাবে কথা বলতে পারেন।

এক নজরে

  • শ্রেণি: অ্যান্টি-এমেটিক (বমি-রোধী ওষুধ)
  • তালিকা: ভারতের NLEM 2022-এ "Antiemetics" অংশে আছে (সেকশন 17.2.1)। WHO-র ২০২৩ সালের অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় আমরা এর নাম পাইনি
  • রূপ: গিলে খাওয়ার ট্যাবলেট ও তরল (NHS)
  • কেনা: NHS অনুযায়ী শুধু প্রেসক্রিপশনে পাওয়া যায়

কী কাজে ব্যবহার হয়?

NHS জানায়, ডমপেরিডন মূলত গা গুলোনো ও বমি কমাতে ব্যবহার হয়। জীবনের শেষ পর্যায়ের যত্নে (প্যালিয়েটিভ কেয়ার) পেটের ব্যথাতেও কখনো এটি দেওয়া হয়। এছাড়া বুকের দুধ খাওয়াতে সমস্যা হলে এবং অন্য উপায় কাজ না করলে, বিশেষজ্ঞ কখনো কখনো দুধের পরিমাণ বাড়াতে এটি বিবেচনা করেন, যদিও ওষুধটি এই উদ্দেশ্যে তৈরি নয়।

বমির পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে, যেমন পেটের সংক্রমণ, খাবারে বিষক্রিয়া, মাইগ্রেন, গর্ভাবস্থা বা অন্য কোনো গুরুতর অসুখ। তাই বারবার বমি হলে শুধু ওষুধ দিয়ে উপসর্গ চাপা না দিয়ে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে শরীরে জলের ঘাটতি দ্রুত হতে পারে, তাই দেরি না করে ডাক্তার দেখান।

কীভাবে কাজ করে?

NHS-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডমপেরিডন পাকস্থলীর উপরের দিকের পেশিকে শক্ত করে এবং নিচের দিকের পেশিকে শিথিল করে, ফলে খাবার উপরের দিকে ফিরে আসার প্রবণতা কমে। একই সঙ্গে এটি মস্তিষ্কের বমি নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্রে যাওয়া সংকেত আটকে দেয়, তাই গা গুলোনো কমে। NHS বলে, অন্য কিছু বমি-রোধী ওষুধের তুলনায় এটি থেকে ঘুম ঘুম ভাব আসার সম্ভাবনা কম।

খাওয়ার নিয়ম নিয়ে সাধারণ কথা

মাত্রা ও কতদিন খাবেন, তা শুধু ডাক্তার ঠিক করবেন; এখানে কোনো মাত্রা লেখা হচ্ছে না। NHS-এর কয়েকটি সাধারণ নির্দেশ:

  • ট্যাবলেট গোটা গিলতে হয়, ভাঙা বা চিবানো নয়।
  • তরল ওষুধ মাপার জন্য সঙ্গে দেওয়া সিরিঞ্জ ব্যবহার করুন, রান্নাঘরের চামচ নয়।
  • সাধারণত খাবারের আগে নেওয়ার কথা বলা হয়।
  • সাধারণত খুব অল্প সময়ের জন্য, প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত দেওয়া হয়, কারণ বেশিদিন বা বেশি মাত্রায় খেলে অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হতে পারে। ডাক্তার সাধারণত সবচেয়ে কম কার্যকর মাত্রা ও সবচেয়ে কম সময়ের পরামর্শ দেন।
  • প্রেসক্রিপশনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেললে দ্রুত বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হতে পারে; তখন সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিন এবং ওষুধের প্যাকেট সঙ্গে নিয়ে যান।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

NHS অনুযায়ী সবচেয়ে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো মুখ শুকিয়ে যাওয়া, যা সাধারণত হালকা এবং নিজে থেকেই সেরে যায়।

গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিরল, তবে নিচের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন বা জরুরি বিভাগে যান (NHS):

  • পেশি বা চোখ অস্বাভাবিকভাবে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে নড়াচড়া করা
  • প্রস্রাব করতে সমস্যা
  • খিঁচুনি
  • দ্রুত বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন
  • গুরুতর অ্যালার্জির লক্ষণ: ঠোঁট, মুখ, গলা বা জিভ হঠাৎ ফুলে যাওয়া, শ্বাস নিতে বা গিলতে কষ্ট, চামড়া বা ঠোঁট নীলচে বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, হঠাৎ বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

জরুরি অবস্থায় নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাবেন না; অন্য কাউকে নিয়ে যেতে বলুন বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন।

কারা আগে ডাক্তারকে জানাবেন

NHS অনুযায়ী ওষুধ শুরুর আগে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে জানান, যদি:

  • এই ওষুধ বা অন্য কোনো ওষুধে কখনো অ্যালার্জি হয়ে থাকে
  • ওজন ৩৫ কেজির কম হয়
  • ক্রোন'স ডিজিজ বা ডাইভার্টিকুলাইটিসের মতো অন্ত্রে বাধা সৃষ্টিকারী রোগ থাকে
  • কখনো পাকস্থলী বা অন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে
  • পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার থাকে
  • লিভার, কিডনি বা হৃদযন্ত্রের সমস্যা, কিংবা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন থাকে

NHS আরও জানায়, ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বেশি, তাই তাঁদের জন্য এটি উপযুক্ত না-ও হতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা

NHS-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন গবেষণায় দেখা গেছে পেটের সংক্রমণে শিশু বা ছোট বাচ্চাদের বমিতে ডমপেরিডন আসলে উপকার করে না। তার উপর অল্প সংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে এটি হৃদযন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। এই কারণে ১২ বছরের কম বয়সীদের জন্য সাধারণত এটি সুপারিশ করা হয় না। তবে অন্য ধরনের বমি বা রিফ্লাক্সে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কখনো কখনো ছোটদের জন্য এটি লিখতে পারেন। তাই বড়দের ওষুধ নিজে থেকে শিশুকে দেবেন না।

গর্ভাবস্থা ও বুকের দুধ

NHS জানায়, অন্য বমি-রোধী ওষুধ কাজ না করলে গর্ভাবস্থায় ডমপেরিডন দেওয়া যেতে পারে। শিশু সুস্থ থাকলে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও অল্প সময়ের জন্য এটি নেওয়া যায় বলে NHS উল্লেখ করেছে; দুধে খুব সামান্য পরিমাণই যায়। শিশুর পাতলা পায়খানা বা অন্য কোনো সমস্যা চোখে পড়লে দ্রুত ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। গর্ভধারণের চেষ্টা, গর্ভাবস্থা বা বুকের দুধ খাওয়ানো, যেকোনো ক্ষেত্রেই আগে ডাক্তারকে জানান।

অন্য ওষুধের সঙ্গে

NHS অনুযায়ী কিছু ওষুধ ও ডমপেরিডন একে অপরের উপর প্রভাব ফেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অবসাদ বা মানসিক রোগের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক বা ছত্রাক-সংক্রমণের ওষুধ, ম্যালেরিয়া বা HIV-এর ওষুধ, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, কিংবা ক্যান্সারের চিকিৎসা চললে অবশ্যই ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে জানান। সাধারণত একসঙ্গে একাধিক বমি-রোধী ওষুধ না খাওয়াই ভালো। ভেষজ ওষুধ ও সাপ্লিমেন্টের নিরাপত্তা নিয়েও যথেষ্ট তথ্য নেই, তাই সেগুলোর কথাও জানান।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

কতক্ষণে কাজ শুরু করে?

NHS অনুযায়ী সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে কাজ শুরু হয়।

মদ্যপান করা যাবে?

NHS মদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়, কারণ এতে ঘুম ঘুম ভাব বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে।

গর্ভনিরোধক বড়ির উপর কি প্রভাব ফেলে?

NHS-এর মতে ডমপেরিডন নিজে গর্ভনিরোধকের কার্যকারিতা কমায় না। কিন্তু বমি না থামলে বড়ি শরীরে ঠিকমতো শোষিত না-ও হতে পারে; সেক্ষেত্রে প্যাকেটের নির্দেশ দেখুন বা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন।

গাড়ি চালানো নিরাপদ?

ঘুম ঘুম ভাব বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হলে গাড়ি বা সাইকেল চালাবেন না, বলে NHS সতর্ক করে।

কাজ না করলে কী করব?

নিজে থেকে মাত্রা বাড়াবেন না বা অন্য বমির ওষুধ যোগ করবেন না। ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলুন; তাঁরা অন্য বিকল্প ভাবতে পারেন।

শেষ কথা

ডমপেরিডন বমি ও গা গুলোনোয় ব্যবহৃত একটি প্রেসক্রিপশন-ওষুধ, কিন্তু হৃৎস্পন্দনের ঝুঁকির কারণে এটি অল্প সময়ের জন্য ও ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে খাওয়ার কথা। শিশু, বয়স্ক এবং হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা দরকার।

উৎস (Sources)

মেডিকেল ডিসক্লেমার

ঔষধ জানুন – Medicine Guide Bangla একটি তথ্যভিত্তিক ব্লগ। এখানে লেখা তথ্য সরকারি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত উৎস থেকে পড়ে নিজের ভাষায় সাজানো হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের শরীর, রোগ ও অন্য ওষুধ আলাদা। তাই এই লেখা দেখে নিজে নিজে কোনো ওষুধ খাবেন না বা বন্ধ করবেন না। ডোজ ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আপনার ডাক্তার নেবেন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান। আমরা কোনো ওষুধ বা ব্র্যান্ড বিক্রি বা প্রচার করি না।

লেখক: ঔষধ জানুন সম্পাদকীয় দল · শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac): ব্যথায় ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

সালবিউটামল ইনহেলার (Salbutamol): হাঁপানিতে ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা

মন্টেলুকাস্ট (Montelukast): হাঁপানি ও অ্যালার্জিতে ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা